১৭ বছরের অপেক্ষার অবসান: আগামীকাল বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়, অর্থাৎ প্রায় ১৭ বছরের প্রতীক্ষার পর আগামীকাল বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক পালাবদল এবং দীর্ঘ আন্দোলনের পর সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের এই সুযোগকে দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সারা দেশ আজ নির্বাচনী আমেজে সরগরম।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও কমিশনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি আগামীকালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নির্বাচন ভবন সূত্রে জানা গেছে, এবার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, “আমরা দেশের মানুষের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।”
সারাদেশে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠানো শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো দেশকে। পুলিশ, র্যাব, আনসার বাহিনীর পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ভোটারদের মধ্যে উৎসবের আমেজ ও শঙ্কা দীর্ঘদিন পর নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে নতুন ভোটাররা, যারা গত দেড় দশকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, তাদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
ঢাকার একটি কেন্দ্রের নতুন ভোটার, ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রায়হান আহমেদ বলেন, “আমার বয়স যখন ১৮ হলো, তখন ভোট দিতে পারিনি। আজ আমি আনন্দিত যে আগামীকাল আমি আমার নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারব।”
তবে উৎসাহের পাশাপাশি কিছুটা শঙ্কাও কাজ করছে সাধারণ মানুষের মনে। অতীতের নির্বাচনী সহিংসতার স্মৃতি মাথায় রেখে অনেকেই আশা করছেন, এবারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে।
আন্তর্জাতিক মহলের কড়া নজরদারি আগামীকালের এই নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেরও কড়া নজরদারি রয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কয়েকশ পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তারা সরেজমিনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে বাড়তি চাপ ও দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর শেষ মুহূর্তের আহ্বান নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়েছে। এতদিন যারা নির্বাচন বর্জন করেছিল বা কোণঠাসা ছিল, তারাও এবার পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নেমেছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
গণতন্ত্রের জন্য এক অ্যাসিড টেস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামীকালের নির্বাচনটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। গত ১৭ বছরে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধারের জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আগামীকাল একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ।
আগামীকাল সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হবে ভোটগ্রহণ। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষার পর বাংলাদেশের মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত নেতৃত্ব বেছে নিতে কতটা সফল হয়।
